মুদ্রা
মূল্য প্রতিটি প্রোভাইডারের দেওয়া হিসেবেই বাংলাদেশি টাকায় (BDT) দেখানো হয়েছে।

ভ্রমণ

কক্সবাজার নামকরণের ইতিহাস: পালংকি থেকে কক্সবাজার

কক্সবাজার নামকরণের ইতিহাস

কক্সবাজার নামটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত, নীল জলরাশি আর সূর্যাস্তের দৃশ্য। কিন্তু এই নামটির পেছনে রয়েছে আড়াই শতাব্দীর এক ইতিহাস—আরাকান শরণার্থীদের পুনর্বাসন, এক ব্রিটিশ অফিসারের অবদান এবং একটি বাজারের গল্প। এই পেজে কক্সবাজার নামকরণের ইতিহাস, প্রাচীন নাম পালংকি ও পানোয়া, ক্যাপ্টেন হিরাম কক্সের ভূমিকা এবং কীভাবে 'কক্স সাহেবের বাজার' থেকে কক্সবাজার হলো—সবকিছু ধাপে ধাপে বাংলায় দেওয়া হলো।

📜 প্রাচীন নাম: পালংকি ও পানোয়া

কক্সবাজারের ইতিহাস শুরু হয় মুঘল আমলের আগে থেকেই। এই অঞ্চলের প্রাচীনতম নাম ছিল 'পানোয়া' (Panowa), যার আক্ষরিক অর্থ 'হলুদ ফুল' । অতীতে কক্সবাজারের আশপাশের এলাকাগুলো এই হলুদ ফুলে ভরে থাকত, সেই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য থেকেই আদি অধিবাসীরা এই অঞ্চলের নাম দিয়েছিলেন 'পানোয়া' । পরবর্তীতে এই অঞ্চলটি 'পালংকি' বা 'পালঙ্কী' নামে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে ।

ইতিহাস অনুযায়ী, নবম শতাব্দীর গোড়ার দিক থেকে ১৬১৬ সালে মুঘল অধিগ্রহণের আগে পর্যন্ত কক্সবাজারসহ চট্টগ্রামের একটি বড় অংশ আরাকান রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল । মুঘল সম্রাট শাহ সুজা পাহাড়ি রাস্তা ধরে আরাকান যাওয়ার পথে কক্সবাজারের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হন এবং এখানেই অস্থায়ী দুর্গ স্থাপনের আদেশ দেন । তাঁর যাত্রাবহরের প্রায় এক হাজার পালকি (পালঙ্কী) চকরিয়ার ডুলাহাজারা নামক স্থানে অবস্থান নেয়। 'ডুলাহাজারা' শব্দের অর্থ 'হাজার পালকি' ।

💡 প্রাচীন নাম সম্পর্কে জানুন

  • পানোয়া: আক্ষরিক অর্থ 'হলুদ ফুল'; প্রাকৃতিক সৌন্দর্য থেকে উদ্ভূত নাম
  • পালংকি: কক্সবাজারের সবচেয়ে পরিচিত প্রাচীন নাম
  • ডুলাহাজারা: 'হাজার পালকি' অর্থে চকরিয়ার একটি স্থানের নাম

মুঘলদের পরে ত্রিপুরা ও আরাকানিরা, এরপর পর্তুগিজ এবং সর্বশেষ ব্রিটিশরা এই এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেয় । ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃক চট্টগ্রামের কর্তৃত্ব লাভের পর এই অঞ্চলে জনবসতি বৃদ্ধি পায়।

👤 ক্যাপ্টেন হিরাম কক্স: নামের পেছনের মানুষ

কক্সবাজার নামের সঙ্গে যে নামটি অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত, তিনি হলেন ক্যাপ্টেন হিরাম কক্স। তিনি ছিলেন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একজন অফিসার । ১৭৭৩ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অধ্যাদেশ জারি হওয়ার পর ওয়ারেন হেস্টিংস বাংলার গভর্নর হিসেবে নিযুক্ত হন। সেই সময় হিরাম কক্সকে পালংকির মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় ।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৭৮৪ সালে বার্মার রাজা বোধপায়া আরাকান দখল করে আরাকানীদের উপর নৃশংস অত্যাচার চালান। বর্মীদের অত্যাচার থেকে রেহাই পেতে প্রায় ১৩ হাজার আরাকানি কক্সবাজার অঞ্চলে আশ্রয় নেয় । এই শরণার্থীদের পুনর্বাসনের দায়িত্ব দেওয়া হয় ক্যাপ্টেন হিরাম কক্সকে । তিনি আরাকান শরণার্থী এবং স্থানীয় রাখাইনদের মধ্যে বিদ্যমান হাজার বছরের পুরোনো সংঘাত নিরসনের চেষ্টা করেন এবং শরণার্থীদের পুনর্বাসনে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি সাধন করেন ।

কিন্তু কাজ পুরোপুরি শেষ করার আগেই ১৭৯৯ সালে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ক্যাপ্টেন হিরাম কক্স মৃত্যুবরণ করেন । রামু উপজেলার ফতেখাঁরকুল এলাকায় তাঁর বাংলোবাড়িটি এখনও রয়েছে, যা 'হিরাম কক্সের বাংলোবাড়ি' নামে পরিচিত । কক্সবাজার শহর থেকে এই বাংলোর দূরত্ব প্রায় ২৫ কিলোমিটার।

⚠️ মনে রাখবেন: ক্যাপ্টেন হিরাম কক্সের মৃত্যুর সাল নিয়ে কিছু সূত্রে ভিন্নতা রয়েছে। কিছু সূত্রে ১৭৯৮ এবং কিছু সূত্রে ১৭৯৯ উল্লেখ করা হয়েছে । তবে তাঁর মৃত্যুর পরই বাজার প্রতিষ্ঠার ঘটনা সব সূত্রে স্বীকৃত।

🏪 কক্স সাহেবের বাজার থেকে কক্সবাজার

ক্যাপ্টেন হিরাম কক্সের পুনর্বাসন অবদানকে স্মরণীয় করে রাখতে একটি বাজার প্রতিষ্ঠা করা হয় । প্রথমে বাজারটি 'কক্স সাহেবের বাজার' নামে পরিচিত ছিল। পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে 'কক্স-বাজার' এবং 'কক্সবাজার' নামের উৎপত্তি ঘটে ।

সময়ের সাথে সাথে এই বাজার একটি জনপদে পরিণত হয়। ১৮৫৪ সালে কক্সবাজার থানা প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ওই বছরই কক্সবাজার, চকরিয়া, মহেশখালী ও টেকনাফ থানা সমন্বয়ে কক্সবাজার মহকুমা গঠিত হয় । ১৮৬৯ সালে কক্সবাজার পৌরসভা গঠিত হয় । ১৯৮৪ সালের ১ মার্চ কক্সবাজার মহকুমাকে জেলায় উন্নীত করা হয়।

নাম সময়কাল বিবরণ
পানোয়া প্রাচীন 'হলুদ ফুল' অর্থে প্রাচীনতম নাম
পালংকি মধ্যযুগ কক্সবাজারের সর্বাধিক পরিচিত প্রাচীন নাম
কক্স সাহেবের বাজার আনুমানিক ১৮০০-এর দশকের শুরু হিরাম কক্সের স্মরণে প্রতিষ্ঠিত বাজার
কক্সবাজার পরবর্তী সময় বর্তমান নাম, যা জেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত

📅 ইতিহাসের সময়রেখা

কক্সবাজার নামকরণের ইতিহাসকে সহজে বুঝতে নিচের সময়রেখাটি অনুসরণ করা যেতে পারে। প্রতিটি ঘটনা নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে সংগৃহীত।

সময়কাল ঘটনা
নবম শতক কক্সবাজারসহ বৃহত্তর চট্টগ্রাম হরিকেলের রাজা কান্তিদেবের শাসনাধীন
১৬১৬ মুঘল অধিগ্রহণ; এর আগে পর্যন্ত কক্সবাজার আরাকান রাজ্যের অংশ ছিল
১৭৭৩ ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অধ্যাদেশ; হিরাম কক্স পালংকির মহাপরিচালক নিযুক্ত
১৭৮৪ বার্মার রাজা আরাকান দখল; প্রায় ১৩ হাজার আরাকানি পালংকিতে আশ্রয় নেয়
১৭৯৯ ক্যাপ্টেন হিরাম কক্সের মৃত্যু; তাঁর স্মরণে বাজার প্রতিষ্ঠা
১৮৫৪ কক্সবাজার থানা ও মহকুমা প্রতিষ্ঠা
১৮৬৯ কক্সবাজার পৌরসভা গঠন
১৯৮৪ কক্সবাজার মহকুমা থেকে জেলায় উন্নীত

💡 ইতিহাস থেকে যা শেখা যায়

  • একটি নামের পেছনে থাকে মানুষের জীবন, সংগ্রাম ও অবদানের গল্প।
  • শরণার্থী পুনর্বাসনের মতো মানবিক কাজের স্মরণে গড়ে ওঠা বাজার আজ একটি জেলার নাম।
  • ইতিহাসের বিভিন্ন স্তর—আরাকান, মুঘল, পর্তুগিজ, ব্রিটিশ—কক্সবাজারের সংস্কৃতিতে প্রভাব ফেলেছে।

❓ সচরাচর জিজ্ঞাসা

কক্সবাজার নামটি কীভাবে এসেছে?

কক্সবাজার নামটি এসেছে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অফিসার ক্যাপ্টেন হিরাম কক্সের নাম থেকে। তিনি পালংকি অঞ্চলে আরাকান শরণার্থীদের পুনর্বাসনের দায়িত্বে নিযুক্ত ছিলেন। তাঁর অবদানের স্মরণে একটি বাজার প্রতিষ্ঠা করা হয়, যা প্রথমে 'কক্স সাহেবের বাজার' নামে পরিচিত ছিল। পরবর্তীতে তা কক্সবাজার নামে পরিচিতি লাভ করে ।

কক্সবাজারের প্রাচীন নাম কী ছিল?

কক্সবাজারের প্রাচীন নাম ছিল পালংকি । এছাড়া এটি পানোয়া নামেও পরিচিত ছিল, যার আক্ষরিক অর্থ 'হলুদ ফুল' । অতীতে কক্সবাজারের আশপাশের এলাকা হলুদ ফুলে ভরে থাকত বলে এই নামকরণ করা হয়েছিল ।

ক্যাপ্টেন হিরাম কক্স কে ছিলেন?

ক্যাপ্টেন হিরাম কক্স ছিলেন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একজন অফিসার । ১৭৭৩ সালের পর তিনি পালংকির মহাপরিচালক হিসেবে নিযুক্ত হন । তিনি আরাকান শরণার্থী ও স্থানীয় রাখাইনদের মধ্যে সংঘাত নিরসনের চেষ্টা করেন এবং শরণার্থী পুনর্বাসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন । কাজ শেষ করার আগেই ১৭৯৯ সালে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন ।

কক্সবাজার থানা ও পৌরসভা কবে প্রতিষ্ঠিত হয়?

কক্সবাজার থানা প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৫৪ সালে এবং পৌরসভা গঠিত হয় ১৮৬৯ সালে । পরবর্তীতে ১৯৮৪ সালের ১ মার্চ কক্সবাজার মহকুমাকে জেলায় উন্নীত করা হয়।

ডুলাহাজারা নামের উৎপত্তি কীভাবে হয়?

মুঘল সম্রাট শাহ সুজা আরাকান যাওয়ার পথে কক্সবাজারের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে সেনাবাহিনীকে এখানে শিবির স্থাপনের নির্দেশ দেন। তাঁর সেনাবাহিনীর প্রায় এক হাজার পালকি (পালঙ্কী) চকরিয়ার ডুলাহাজারা নামক স্থানে অবস্থান নেয়। 'ডুলাহাজারা' শব্দের অর্থ 'হাজার পালকি' ।

📝 জরুরি তথ্য ও শর্তাবলী

• এই পেজে প্রদত্ত ঐতিহাসিক তথ্য শিক্ষক বাতায়ন, বাংলাপিডিয়া, বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন ও সংবাদ সূত্র থেকে সংগৃহীত।

• ঐতিহাসিক ঘটনার তারিখ ও বিবরণে বিভিন্ন সূত্রে কিছুটা ভিন্নতা থাকতে পারে।

• Coxroom.com শুধু তথ্য সরবরাহ করে; ঐতিহাসিক তথ্যের নির্ভুলতার জন্য সংশ্লিষ্ট মূল সূত্র দেখার পরামর্শ দেওয়া হয়।

• এই পেজের তথ্য শিক্ষামূলক ও তথ্যমূলক উদ্দেশ্যে প্রকাশিত।

লেখাটি যেভাবে বলে, সেভাবে সফর সাজান

এই ডিরেক্টরির আসল তালিকা — হোটেল বা সেবাদাতার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করুন। CoxRoom কোনো বুকিং নেয় না।

হোটেল

সব হোটেল দেখুন

দর্শনীয় স্থান

সব দর্শনীয় স্থান দেখুন
সব লেখা দেখুন