সারাদেশ ভ্রমণ

বাংলাদেশের সেরা দ্বীপ: তালিকা, বৈশিষ্ট্য ও ভ্রমণ তথ্য

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ হলেও বঙ্গোপসাগরের বুকে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য দ্বীপ। প্রতিটির নিজস্ব সৌন্দর্য, ইতিহাস ও বৈশিষ্ট্য আলাদা। কেউ বিখ্যাত প্রবাল ও সৈকতের জন্য, কেউ হরিণ ও ম্যানগ্রোভের জন্য, আবার কেউ নির্জনতা ও বাতিঘরের জন্য। এই গাইডে বাংলাদেশের সেরা দ্বীপগুলোর একটি তালিকা, তাদের বৈশিষ্ট্য এবং ভ্রমণের প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়া হলো।

🏝️ বাংলাদেশের সেরা দ্বীপের তালিকা

বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে ও নদীর মোহনায় ছড়িয়ে থাকা দ্বীপগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি নিচের তালিকায় দেওয়া হলো। প্রতিটি দ্বীপের বিশেষত্ব আলাদা।

দ্বীপের নাম অবস্থান প্রধান আকর্ষণ
সেন্ট মার্টিন কক্সবাজার প্রবাল দ্বীপ, সৈকত
নিঝুম দ্বীপ নোয়াখালী (হাতিয়া) চিত্রা হরিণ, পাখি, ম্যানগ্রোভ
কুতুবদিয়া কক্সবাজার বাতিঘর, লবণ চাষ, নির্জন সৈকত
মহেশখালী কক্সবাজার আদিনাথ মন্দির, পাহাড়, লবণ মাঠ
চর কুকরি-মুকরি ভোলা ইকোপার্ক, ম্যানগ্রোভ, হরিণ
মনপুরা ভোলা সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত, হরিণ, নির্জনতা
সন্দ্বীপ চট্টগ্রাম নদী দ্বীপ, ক্যাম্পিং, মসজিদ
হাতিয়া নোয়াখালী বৃহৎ চরাঞ্চল, মৎস্য
ভোলা ভোলা দেশের বৃহত্তম দ্বীপ
ঢালচর ভোলা (চরফ্যাশন) তারুয়া সৈকত, ম্যানগ্রোভ

🐠 সেন্ট মার্টিন দ্বীপ

সেন্ট মার্টিন বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ। কক্সবাজার জেলার দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরে অবস্থিত এই দ্বীপটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত। এখানে হরেক রকমের সামুদ্রিক মাছ, কোরাল এবং বালু সৈকত পাওয়া যায়। দ্বীপটি পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়, তবে পরিবেশগত সংবেদনশীলতার কারণে সরকার মাঝে মাঝে ভ্রমণে বিধিনিষেধ আরোপ করে।

সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ১ নভেম্বর ২০২৬ থেকে ১৫ মার্চ ২০২৭ পর্যন্ত পর্যটকরা সেন্ট মার্টিনে যাতায়াত করতে পারবেন। প্রতিদিন গড়ে সর্বোচ্চ সাড়ে ৩ হাজার পর্যটক দ্বীপে যেতে পারবেন এবং প্রত্যেক পর্যটককে ১০০ টাকা পরিবেশ সংরক্ষণ ফি দিতে হবে। নভেম্বর মাসে রাতযাপনে বিধিনিষেধ থাকলেও ১ ডিসেম্বর থেকে পর্যটকরা রাতে অবস্থান করতে পারবেন। ভ্রমণের আগে সর্বশেষ সরকারি নির্দেশনা যাচাই করে নেওয়া জরুরি।

🦌 নিঝুম দ্বীপ

নিঝুম দ্বীপ নোয়াখালী জেলার হাতিয়া উপজেলার অন্তর্গত। মেঘনা নদীর মোহনায় বঙ্গোপসাগরের বুকে জেগে ওঠা এই দ্বীপটি বল্লারচর, চর ওসমান, কামলার চর ও চর মুরি—এই চারটি ছোট দ্বীপের সমন্বয়ে গঠিত। ২০০১ সালের ৮ এপ্রিল এটি জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষিত হয়।

নিঝুম দ্বীপের প্রধান আকর্ষণ চিত্রা হরিণ ও শীতকালের অতিথি পাখি। একসঙ্গে এত চিত্রা হরিণ দেশের আর কোথাও দেখা যায় না। এছাড়া নামা বাজার সৈকত থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখা যায় এবং বারবিকিউ করার সুযোগ আছে। শীতকালে এখানে ৮১ প্রজাতির জলচর পাখি দেখা যায়, যার মধ্যে বিপদগ্রস্ত দেশি গাঙচষা উল্লেখযোগ্য।

🗼 কুতুবদিয়া দ্বীপ

কুতুবদিয়া দ্বীপ কক্সবাজার জেলার অন্তর্গত। দ্বীপটির মূল আকর্ষণ প্রায় ২০০ বছরের পুরনো বাতিঘর। কর্ণফুলী নদীর মোহনা থেকে প্রায় ৪০ মাইল দূরে অবস্থিত এই বাতিঘরটি একসময় নাবিকদের দিকনির্দেশনা দিত। এছাড়া এখানে নির্জন সমুদ্রসৈকত, কুতুব আউলিয়ার মাজার এবং দেশের একমাত্র বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্র আছে। লবণ চাষের জন্যও দ্বীপটি প্রসিদ্ধ।

কুতুবদিয়ায় পর্যটকদের থাকার জন্য মানসম্মত হোটেল আছে, যেখানে খরচ হতে পারে আনুমানিক ৮০০ থেকে ১,৫০০ টাকা। তবে দ্বীপটি বর্তমানে বেড়িবাঁধের অভাবে অস্তিত্ব সংকটে আছে বলে প্রতিবেদন পাওয়া যায়। ভ্রমণের আগে স্থানীয় পরিস্থিতি যাচাই করে নেওয়া ভালো।

⛰️ মহেশখালী দ্বীপ

কক্সবাজারের কাছে অবস্থিত মহেশখালী দ্বীপটি পাহাড়ি এলাকা এবং বৌদ্ধ মন্দিরের জন্য পরিচিত। দ্বীপটির অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান আদিনাথ মন্দির। এছাড়া এখানে লবণ মাঠ ও মাতারবাড়ি এলাকা আছে।

সরকার মহেশখালী-মাতারবাড়িকে পর্যটন গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছে। এই পরিকল্পনায় ইকো-ট্যুরিজম পার্ক, সংরক্ষণ এলাকা ও গ্রিন করিডোর অন্তর্ভুক্ত আছে। বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ১,০০০ থেকে ১,২০০ পর্যটক মহেশখালী ভ্রমণে যান।

🌿 চর কুকরি-মুকরি

ভোলা জেলার চরফ্যাশন উপজেলার অন্তর্গত চর কুকরি-মুকরি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত। পাখি, হরিণ এবং বিভিন্ন প্রজাতির গাছগাছালির জন্য এটি বিশেষভাবে আকর্ষণীয়। দ্বীপটি সবুজে ঘেরা এবং সাম্প্রতিক সময়ে যোগাযোগ ও থাকার ব্যবস্থার উন্নতি হওয়ায় পর্যটকদের আকর্ষণ বাড়ছে।

কুকরি-মুকরির দর্শনীয় স্পটগুলোর মধ্যে ইকোপার্ক, নারিকেল বাগান, কুকরি বীচ, ঝুলন্ত সেতু ও মাকড়শার জাল উল্লেখযোগ্য। শীতকালে এখানে পর্যটকদের ভিড় বাড়ে।

🌅 মনপুরা দ্বীপ

ভোলার কাছাকাছি অবস্থিত মনপুরা দ্বীপটি নির্জনতা এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত। সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার জন্য পর্যটকদের কাছে এটি পছন্দের স্থান। দ্বীপটির আয়তন প্রায় ৩৭৩ বর্গ কিলোমিটার, তিন দিকে মেঘনা নদী আর একদিকে বঙ্গোপসাগর।

আলমনগর কেওড়া বনে নদীর পারে হরিণের পাল দেখা যায়। শীতকালে অতিথি পাখির কলকাকলিতে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। এখানে ক্যাম্পিংয়ের সুযোগও আছে ।

⛵ সন্দ্বীপ

চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলার নামানুসারে পরিচিত এই দ্বীপটি মেঘনা নদীর মোহনায় অবস্থিত। প্রাচীনকাল থেকেই এটি ব্যবসা ও যোগাযোগের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। দ্বীপটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৫০ কিলোমিটার এবং প্রস্থ ৫ থেকে ১৫ কিলোমিটার।

সন্দ্বীপে বিনোদনের জন্য সৈকত, মাছ-মুরগি ও সবজির রেস্তোরাঁ আছে। দ্বীপের উত্তরে প্রায় শতাব্দী প্রাচীন মরিয়ম বিবি সাহেবানী মসজিদ আছে, যা তাজমহলের স্থাপত্য অনুসরণে নির্মিত। অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীরা এখানে ক্যাম্পিং করতে পারেন।

🐟 হাতিয়া দ্বীপ

নোয়াখালী জেলার অন্তর্গত হাতিয়া দ্বীপ বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ চরাঞ্চল। এটি কৃষি এবং মৎস্য শিকারের জন্য বিখ্যাত। প্রায় ২,১০০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই দ্বীপে আট লাখের বেশি মানুষ বসবাস করেন।

হাতিয়ায় যাতায়াতের প্রধান এবং একমাত্র মাধ্যম নৌপথ। নোয়াখালী জেলা থেকে ১৮ কিলোমিটার নৌপথ পাড়ি দিয়ে দ্বীপে যেতে হয়। নিঝুম দ্বীপ হাতিয়ার কাছেই অবস্থিত, তাই অনেক পর্যটক হাতিয়া হয়ে নিঝুম দ্বীপে যান।

🏞️ ভোলা দ্বীপ

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দ্বীপ ভোলা, যা মেঘনা নদীর মোহনায় অবস্থিত। ভোলা তার চরের সৌন্দর্য এবং কৃষিজ উৎপাদনের জন্য পরিচিত। এটি দেশের একমাত্র দ্বীপ জেলা।

ভোলা থেকে চর কুকরি-মুকরি, মনপুরা ও ঢালচরের মতো দ্বীপে যাওয়া যায়। ভোলার সাথে মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগ মূলত নৌপথে হলেও সড়ক সংযোগের উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।

🏖️ ঢালচর

ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার প্রত্যন্ত দ্বীপ ঢালচর তারুয়া সমুদ্রসৈকত, ম্যানগ্রোভ বন ও নদীকেন্দ্রিক জীবনযাত্রার জন্য পর্যটকদের আকর্ষণ করে। মেঘনা নদী পেরিয়ে আনন্দবাজার ঘাটে পৌঁছানোর পর দ্বীপে প্রবেশ করা যায়।

ঢালচরে পর্যটনের সম্ভাবনা থাকলেও যোগাযোগব্যবস্থা, চিকিৎসা সেবা ও অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা আছে। যারা একেবারে অফবিট ও প্রত্যন্ত দ্বীপের অভিজ্ঞতা চান, তাদের জন্য ঢালচর উপযুক্ত।

❓ সচরাচর জিজ্ঞাসা

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দ্বীপ কোনটি?

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দ্বীপ ভোলা। এটি মেঘনা নদীর মোহনায় অবস্থিত এবং আয়তনে দেশের দ্বীপগুলোর মধ্যে সর্ববৃহৎ।

বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ কোনটি?

সেন্ট মার্টিন দ্বীপ বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ। কক্সবাজার জেলার দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরে অবস্থিত এই দ্বীপটি প্রবাল, সামুদ্রিক মাছ ও বালু সৈকতের জন্য বিখ্যাত।

নিঝুম দ্বীপে কী কী দেখা যায়?

নিঝুম দ্বীপে চিত্রা হরিণ, শীতকালীন অতিথি পাখি, ম্যানগ্রোভ বন এবং নামা বাজার সৈকত থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখা যায়। দ্বীপটি ২০০১ সালে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষিত হয়।

কুতুবদিয়া দ্বীপের বিশেষত্ব কী?

কুতুবদিয়া দ্বীপ প্রায় ২০০ বছরের পুরনো বাতিঘরের জন্য বিখ্যাত। এছাড়া নির্জন সৈকত, কুতুব আউলিয়ার মাজার, দেশের একমাত্র বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং লবণ চাষের জন্য দ্বীপটি পরিচিত।

মহেশখালী দ্বীপে কী দেখার আছে?

মহেশখালী দ্বীপে আদিনাথ মন্দির, পাহাড়ি এলাকা, লবণ মাঠ এবং মাতারবাড়ি এলাকা উল্লেখযোগ্য। সরকার মহেশখালী-মাতারবাড়িকে পর্যটন গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছে।

📝 জরুরী তথ্য ও শর্তাবলী

• এই পেজে দেওয়া তথ্য সাধারণ ভ্রমণ নির্দেশনার জন্য; নির্দিষ্ট দ্বীপের নিয়ম, সময়সূচি ও খরচ পরিবর্তন সাপেক্ষ।

• Coxroom.com শুধু তথ্য সরবরাহ করে; বুকিং, পেমেন্ট বা সেবার দায়ভার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের।

• সেন্ট মার্টিনসহ সংবেদনশীল দ্বীপগুলোতে ভ্রমণের আগে সর্বশেষ সরকারি নির্দেশনা যাচাই করুন।

• দ্বীপগুলোর পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় দায়িত্বশীল আচরণ করুন।

লেখাটি যেভাবে বলে, সেভাবে সফর সাজান

এই ডিরেক্টরির আসল তালিকা — হোটেল বা সেবাদাতার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করুন। CoxRoom কোনো বুকিং নেয় না।

হোটেল

সব হোটেল দেখুন

দর্শনীয় স্থান

সব দর্শনীয় স্থান দেখুন
সব লেখা দেখুন